বই – ব​ড়, ছোট, মাঝারি…

1140-yeager-sell-your-used-books.imgcache.rev661df3f628ce819a8306ca96aa6bc36f
vital

খোলা জানলা, দূরে একটা নারকেল গাছ মাথা দুলিয়ে কিছু বলে চলেছে; বাকি আম সুপুরি, ঝাউ, জবা, কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো সায় দিচ্ছে, কখনো বা নিশ্চুপ অসম্মতি। ৯:২৩ এর স্বল্প জোরালো রোদটা ফাঁকতালে বিছানার উপর এসে শুয়ে, আমিও পাশে শুয়ে; সাথে এক বাটি মুড়ি-চানাচুর আর সামনে ইতস্তত একটা বই। বই-এর নাম কোনি। খাচ্ছি আর ডুব দিচ্ছি, আর আস্তে আস্তে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডুবে যাচ্ছি। হঠাৎ মায়ের ঠান্ডা হাতের ছোঁয়ায় পিঠ গরম। অগত্যা উঠে, পড়ার(পড়ুন পয়সা কামানোর) বই খুলে বসি।
হ্যাঁ, এরকম প্রায়শই ঘটতে থাকে আমাদের জীবনে, গল্পপ্রিয় মানুষের জীবনে। দুপুরে হঠাৎ ভাবনাটার প্রসব যন্ত্রণা শুরু- ছোট থেকে আমাদের কাছে বই-এর বিবর্তন কিভাবে? ব্যস, লেবার পেইন সহ্য করতে না পেরে ডেলিভারি দিচ্ছি।

১. গেঁড়ে বয়স(৩-৪ বছর):

বর্ণপরিচয়, কথামালা, একে চন্দ্র দুয়ে পক্ষ, অ-এ অজগর আসে তখন। এই বয়সের প্রধান নিয়ম- পড়া পরে, ছবি দেখা আগে। নতুন বই মানে তখন একটা সেনসেশন- মানে নতুন নতুন ছবি। প্রথমেই প্রতিটা ছবি মাথাস্থ করা, তারপর পড়া না হলে প্রতিটা আঘাত পিঠস্থ করা।

২. ফুলটিকিট বয়স(৭-১০):

এই সময় নিজেদের পড়ার ইচ্ছাটা বেড়ে যায়। সেকশনের প্রতিটা ছেলে-মেয়েকে নিজের পরম শত্রু আর মারপিট নালিশ-এর বন্যা বয়ে যায়। ছবি দেখা আর লেখা পড়ার অদ্ভুত সমতা এই বয়সে উৎপত্তি হয়। এ সময়ের প্রধান বইগত আকর্ষণ আবোল-তাবোল, হ-য-ব-র-ল। এ সময় নতুন করে যোগ বিয়োগের ধাঁধায় হারিয়ে যেতে গিয়েও মায়ের লাঠি ধরে ফিরে আসা যায়। ভূতের গল্প এই স্টেজের মাস্ট-রিড বলেও অনেকের মত। আর কমিক্স না হলে তো খাওয়া বন্ধ। সাথে গোপাল ভাঁড় কমপ্লিমেন্টারি…

৩. টিনের তলোয়ার(১৩-১৯):

এই সময়টায় প্রভূত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। কঠিন থেকে কঠিনের দিকে হুড়মুড়িয়ে দৌড়, বিজ্ঞান, গুন-ভাগ, নিউ হরাইজন, কুমোর পাড়ার গোরুর গাড়ি থেকে নেমে ট্রান্সলেশন, ভয়েস, ন্যারেশন উল্টে ফেলা, অঙ্কে পাটিগণিত, বীজগণিত, জ্যামিতির কঠিন ভ্রুকুটি, আর তার কিছুদিন পরে ইন্টিগ্রেশন, প্রোবাবিলিটি, এপি-জিপি-র লাইনে নাজেহাল অবস্থা, বিজ্ঞান আবার দু’দিকে চলে গিয়ে নিজেকে ফিজিক্স কেমিস্ট্রিতে ভাগ করে ফেলে। জীবনানন্দ, সুকান্ত, নজরুল, কঠিন রবিঠাকুর বেঁকিয়ে কথা বলেন, কোথা থেকে যেন চর্যাপদ নামের জঙ্গীহানা হয়ে যায়। এই সময়কাল থেকেই পড়ার বই থেকে অনেকে আস্থা হারান। এই সময় আনন্দমেলা,শীর্ষেন্দু, মতি নন্দী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-দের গিলে খাওয়ার প্রবণতা প্রধান। গুটিকয়েক ছেলে কবিতা পড়তে শুরু করে এখান থেকেই। আর লুকিয়ে নিষিদ্ধ বই তো ফাঁকা বাড়ির নিত্যসঙ্গী।

৪. চাকরি করতে হবে বয়স(২৩ঊর্ধ্ব):

এই সময় বইয়ের সাথে সম্পর্ক মোটামুটি টেটে-চাকরিতে। এই সময়ের হিড়িক- রিসনিং, ক্লাস ১০-এর অঙ্ক, অদ্ভুতুড়ে ইংরেজি গ্রামার, আর অশ্রাব্য জিকে। অর্থাৎ সরকারি চাকরি। বেশিরভাগ না পেয়ে ইন্টার্ভিউ রুমের গরম বাড়ান। আর যাঁরা পান, তাঁদের স্থান মহাকাশে। তবে যাঁরা উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী তাঁদের দেখা যায় কোন ইউনিভারসিটিতে অঙ্ক, ইংরেজি, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি নিয়ে ঘষামাজা করতে। আবার অনেকে যন্ত্রপাতি খুলছেন, আর কেউ মানুষের দেহ কেটে ভিতরের যন্ত্রপাতি বের করছেন। কিছুসংখ্যক শখপূরণে ব্যস্ত। গান, নাটক, নাচ, আঁকা ইত্যাদি… এই পাক্ষিক মানুষ শেক্সপিয়ার, রবিঠাকুর, আগাথা, শঙখ ঘোষ, শ্রীজাত প্রভৃতি প্রভৃতি নিয়ে মেতে থাকেন। অন্য কোন দিকে তাকানোর সময় দেওয়া তাঁদের কাছে দুঃসাধ্য। বইয়ের প্রতিটা গন্ধ তারা শুষে নেন। হারিয়ে ফেলেন নিজেকে বইয়ের ভিতর। গল্প পড়াটা তাঁদের একটা তাগিদ হয়ে দাঁড়ায় তখন। আর অ্যাডাল্ট গল্প তখন উত্তেজনার স্থানে আর্টের চেয়ারে সিটদখল করে…

এভাবেই আমি দেখি গল্প পড়ার বিবর্তন। কারও ঠেস লাগলে কিছু করার নেই। নিজস্ব মতামত।

পুনশ্চ- বাঙালি বাচ্চাদের কথা উল্লিখিত।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s